»স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর বাইশারীতে বিদ্যুতের আলো »৫ ডিসেম্বর শহীদ দৌলত দিবস : জাতীয়ভাবে দিবসটি পালনের দাবি শহীদ পরিবারের »ধর্মপুর দরবার শরীফের পীরের উপর হামলা্ : রামুতে মানববন্ধন : জড়িতদের শাস্তি দাবি »রামুর উখিয়ারঘোনায় আলহাজ্ব সাইমুম সরওয়ার কমল উচ্চ বিদ্যালয় ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন »রামুর আল হাবিব লাইব্রেরীর মালিকের বসত ঘর পুড়ে ছাই ॥ ক্ষয়ক্ষতি ৩০ লক্ষ টাকার »বাংলাদেশ ফটোজার্নালিষ্ট এসোসিয়েশনের জাতীয় সম্মেলনে ইকবাল সোবহান »কক্সবাজার রেল লাইন সম্প্রসারণের কাজ তদারকিতে এডিবি ও এম,পি কমল »কক্সবাজার জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাবু পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় যুবলীগের বিশাল সংবর্ধনা »কক্সবাজার স্টেডিয়ামে সাবেক তারকাদের জমজমাট প্রীতি ফুটবল ম্যাচ ৩০ নভেম্বর »সাংবাদিক তপন চক্রবর্তী বিএফইউজে’র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ায় রামু নিউজ ডট কম’র অভিনন্দন »রামু উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ কামরুজ্জামান ভুট্টো’র মায়ের ইন্তেকাল ॥ এমপি কমল ও যুবলীগের শোক »কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের জরুরী সভা ৩০ নভেম্বর »“দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বিমানে চড়াতে হবে” : সাইমুম সরওয়ার কমল এমপি »রামুর রশিদনগর ইউনিয়ন যুবলীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত »কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর উদ্যোগে সুফিয়া কামালের জীবনালেক্ষ্য নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত

অশোকের “কলিঙ্গানুশাসন”

জ্যোতি বিকাশ বড়ুয়া: দীর্ঘদিন ধরে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের লাদাখ (যাকে ‘মিনি তিব্বত’ নামে অভিহিত করা হয়) ভ্রমণের ইচ্ছে পোষণ করে আসছিলাম। কিন্তু নানা কারণে হয়ে উঠেনি। অবশেষে জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে, সাহস করে,  লাদাখ ভ্রমণের দুরূহ যাত্রায়, বের হয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি । এই উদ্দেশ্যে,  বাংলাদেশের  ঢাকা থেকে কোলকাতার কয়েকটি ভ্রমণ-সংস্থার সাথে টেলিফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করি। তাদের মধ্যে লেনিন সরনিতে অবস্থিত ‘প্যান-ওয়েস’ নামক একটি ভ্রমণ-সংস্থার ভ্রমণের সময়, যাতায়ত ও দর্শনীয় স্থানের তালিকা ইত্যাদি মোটামুটি পছন্দ হয়। ঢাকা থেকেই তাদের সাথে ভ্রমণ-সূচী মোটামুটি চূড়ান্ত করি। সেই ভ্রমণসূচী অনুযায়ী ২২শে জুন /২০০৮ কোলকাতা থেকে লাদাখের পথে আমাদের যাত্রা শুরু হওয়ার কথা।
১৫ই জুন, ২০০৮ ঢাকা থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনে কোলকাতায় আসি। পরদিন অর্থাৎ ১৬ই জুন সকালে ‘প্যান ওয়েসে’কে ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান ও ভ্রমণের বিস্তারিত চুড়ান্ত কর্মসূচী  জানার জন্য, তাদের অফিস ৮৭ লেনিন সরনিতে যাই। সেখানে প্যান ওয়েস’এর মালিক মিঃ প্রবীর সিনহা রয়ের সাথে আলাপ পরিচয় হয়। তিনি জানান, আমাদের ভ্রমণের তারিখ পিছানো হয়েছে, ভ্রমণ ২২শে জুনের পরিবর্তে ৩০শে জুন শুরু হবে। অথচ ঢাকা ছাড়ার একদিন আগেও আমার সাথে তাঁর ফোনে আলাপ হয়েছে। তিনি জানালেন, কয়েকজন যাত্রী সময় পরিবর্তনের জন্য তাঁকে অনুরোধ করেছেন। অগত্যা আমার আর কিছু করার রইলো না, তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হল। শুধু প্রবীর বাবুকে বলি, এতদিন কোলকাতায় বসে বসে করবোটা কি ? তখন প্রবীর বাবু জানালেন, আগামী ১৯শে জুন তিনি ও তাঁর এক বন্ধু ২/৩ দিনের জন্য ওড়িশ্যার পুরী যাচ্ছেন, ইচ্ছে করলে আমিও তঁদের সাথে যেতে পারি। সানন্দে রাজী হয়ে গেলাম। ঠিক হলো, ২০শে জুন সকালে আমরা কোলকাতা থেকে সড়ক পথে  রওনা হব। আমাকে সকাল সাতটায় গোলপার্ক থেকে তুলে নেবেন।
সেই অনুযায়ী আমি ২০ তারিখ সকালে সাতটার আগেই গোলপার্কে পৌঁছি এবং প্রবীর বাবুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। পৌনে আটটায় প্রবীর বাবু একটি জীপ গাড়ী নিয়ে আসেন। আমাকে তুলে নিয়ে পরে ওনার বন্ধু কুণাল বাবুকে তুলে নেন। কুণাল বাবু কোলকাতার একটি স্পোর্টস ক্লাবের সেক্রেটারী। খুব প্রাণবন্ত ও রসিক মানুষ।
গাড়ী বিদ্যাসাগর সেতু অতিক্রম করে, হাওড়ায় এসে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে ৬ নং জাতীয় মহাসড়ক ধরে এগোতে থাকে।  রাস্তা যতটা ভাল হবে আশা করেছিলাম, ততটা ভাল নয়। পথে প্রবীর বাবুর ড্রাইভার নেমে যায়, প্রবীর বাবু নিজেই গাড়ী চালাতে থাকেন। আমারা দামোদর ও রূপনারায়ণ নদী ক্রস করি। বেলা একটায় পথের ধারে একটা ধাবায় লাঞ্চ সারি। তারপর কিছুদূর এগোনোর পর দেখা গেল, প্রচ- গাড়ীর জ্যাম। চলমান বন্যায় কয়েকটি বিকল্প সড়ক ডুবে যাওয়ার কারণে, সব গাড়ী, বিশেষ করে আন্ত-রাজ্য মাল পরিবহনকারী ট্রাকের বহর এই সড়কে ‘ডাইভার্ট’ হয়ে মাইলের পর মাইল জ্যামের সৃষ্টি করেছে। গাড়ী মাঝে মাঝে দীর্ঘক্ষণ থেমে, কখনো কখনো ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগোয়। কখনো বা মূল সড়ক থেকে নেমে কাঁচা জমি বা বনজঙ্গলের মধ্যদিয়ে ‘ডিট্যুর’ করে গাড়ী কিছু কিছু এগোয়। একসময় পশ্চিমবঙ্গের সীমানা পেরিয়ে ঝাড়খ- রাজ্যে প্রবেশ করি। দেখি, দুই একটি ছোট ছোট জনবসতি ছাড়া রাস্তার দূ’পাশে বেশীর ভাগ জায়গা জুড়ে দৃষ্টিনন্দন গভীর অরণ্য। কয়েক কিলোমিটার পথ যাওয়ার পর, আমরা সুবর্ণরেখা অতিক্রম করে উড়িশ্যা রাজ্যে প্রবেশ করি।

বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম তীরে ভারতবর্ষের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত এই অঞ্চলটি প্রাচীনকালে উৎকল, কলিঙ্গ, ওড্র ইত্যাদি নামে অভিহিত ছিল। ৩০০০ বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ এই ভূখ-ের বর্তমান নাম ওড়িশা বা ওড়িশ্যা। ভারতের ৯ম বৃহৎ রাজ্য, আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা বড় – এক লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার বর্গাকলোমিটার। জনসংখ্যা মাত্র ৩ কোটি ৬৭ লক্ষ। এতে প্রধান উড়িয়া জাতি ছাড়া রয়েছে সাঁওতাল, বোন্দা, মু-া, ওঁরাও, কোড়া, মহালি ইত্যাদি আদিবাসী  জনগোষ্ঠি। এই আদিবাসী জনগোষ্ঠির সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ। বর্নাঢ্য জাতিগুষ্ঠির সম্মিলনে গড়ে উঠেছে অতি উচ্চাঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তার মধ্যে সুমহান ক্লাসিক নৃত্য ‘উড়িশি’ এখন জগদ্বিখ্যাত। ওড়িশ্যায় রয়েছে বনজ ও খনিজ সম্পদের অফুরন্ত ভা-ার। ওড়িশ্যার আর এক উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, তার অসাধারণ মন্দির স্থাপত্য – রাজধানী শহর ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ মন্দির, সমুদ্র শহর পুরীর জগন্নাথ মন্দির ও কোণারকের সূর্য মন্দির ভারত দর্শনের অন্যতম মূখ্য আকর্ষণ। তবে আমার এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য অন্য।
ওড়িশ্যা রাজ্যে প্রবেশ করে প্রথমে যে শহর পাই তার নাম বাংগিরিপোসি। এখান থেকে আমাদের গাড়ী ৬নং জাতীয় মহাসড়ক ছেড়ে ৫নং জাতীয় মহাসড়ক ধরে  এগোতে থাকে। দুই একটি ছোটখাট হাটবাজার ছাড়া পথের ধারে কোথাও তেমন ঘন জনবসতি নেই, বরং বেশ কিছূ অংশ চলে গেছে ঘন অরণ্যের মধ্য দিয়ে। কোন সময় দেখা যায় দূরে অনুচ্চ সবুজ পর্বতমালা। পথের চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আরো কয়েকটি ছোট শহর যথা বারিপদা, বালেশ্বর, ভদ্রক ইত্যাদি ও দুটি বড় নদী ‘তেলেঘাই’ ও ‘বিরূপা’ অতিক্রম করি। ভাবি, এমন সুন্দর নদীটির নাম কেন যে ‘বিরূপা’ হল জানি না। প্রায় সন্ধ্যায় আমরা উড়িশ্যার বৃহত্তম ও প্রাচীনতম নগর কটকে পৌঁছি। আরো প্রায় ৩০কিমি পরে উড়িশ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বর। ভুবনেশ্বর থেকে প্রায় ৬০কিমি দূরে আমাদের গন্তব্য পুরীতে যখন পৌঁছি তখন রাত ৯টায়। পুরীর সমুদ্র সৈকতের সামনের প্রধান সড়ক থেকে অনেকটা ভিতরে, একটা রেষ্ট হাউসে প্রবীর বাবু গাড়ী ঢুকান। এখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা।
আগে থেকে খবর দেয়া ছির বলে, খাবার দাবার সব রেডি। সারাদিনের জার্নীতে খুব ক্লান্ত, তাই তাড়াতাড়ি দুটো খেয়ে শুয়ে পড়ি।

পুরী
পরদিন অর্থাৎ ২১শে জুন সকাল ৯টায় আমরা ব্রেকফাস্ট সারি। প্রবীর বাবুরা ওনাদের ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত থাকবেন। আমি একাই পুরী সমুদ্র সৈকত দেখতে বের হই।
পুরী ওড়িশ্যার একটি প্রাচীন শহর। দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত ও বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরের জন্য ভ্রমণার্থীদের অন্যতম শীর্ষ গন্তব্য।  রেস্ট হাউজ থেকে বের হয়ে অল্প একটু পরেই পুরীর সুপ্রশস্ত মেরিন ড্রাইভ সড়ক।  সড়কের এ পাশে উড়িশ্যার প্রসিদ্ধ হস্তশিল্প ও রকমারি ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র-সম্ভারের বিপনি।  তাছাড়া রয়েছে  কিছু রেস্টুরেন্ট ও হোটেল।  সড়কের অন্যদিকে  উম্মক্ত সমুদ্রসৈকতের বেলাভূমি  ড়কের  লেবেল থেকে  ক্রমশ  ঢালু হয়ে সাগরে  মিলিত হয়েছে।  সড়ক  থেকে  নেমে বেলা-ভূমিতে হাঁটতে থাকি,  শুনি  আছড়ে  পড়া  ঢেউয়ের আর্তনাদ।  কাছে দূরে দেখা যায় অনেক  ছোট ছোট জেলে নৌকা সমুদ্রে মাছ ধরছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে নৌকাগুলি  ঢেউয়ের  ধাক্কায়  যেন  একবার   ডুবছে, একবার ভাসছে। বঙ্গোপসাগরের পশ্চিমতীরে অবস্থিত বলে  এখান থেকে  সূর্যোদয়  দেখা  যায়,  আমাদের
কক্সবাজারের মত সূর্যাস্ত নয়।  পুরীর  সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে মনে হল,  এখান  থেকে  খুব জোরে  সোজা  মেরিন ড্রাইভের ধারে উড়িশ্যার ক্লাসিক হস্ত শিল্পের সম্ভার একটা ঢিল ছুড়তে পারলে তা চট্টগ্রামের সমুদ্রসৈকতে  পৌঁছত।  পুরীর সৈকতটি নোংরা, মাঝে মাঝে  যেন  কোথা থেকে  দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। তবে  ভারত  বাংলাদেশ  ও পৃথিবীর  অন্যান্য  দেশে  যত সমুদ্রসৈকত দেখেছি তার মধ্যে আমেরিকার  নিউ ইয়র্কের হাডস্ন বে সমুদ্রসৈকত’এর  মত নোংরা সৈকত  আর কোথাও দেখি  নি।  অবস্থান,  পরিবেশ,  সৌন্দর্য,  বিস্তৃতি,   প্রসারতা  ইত্যাদির বিচারে  পূরীর সৈকত আমাদের  কক্সবাজারের ধারে কাছেও নয়। বীচে  বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে রেস্ট হাউজে ফিরে আসি।
বিকাল চারটায় প্রবীর বাবুর ঠিক করা ট্যাক্সিতে আমি ও কুণাল বাবু কোণারক’এর বিশ্বখ্যাত সূর্য মন্দির উদ্দেশ্যে বের হই।
কোণারকের এই সূর্য মন্দিরের বিস্তারিত বর্ণনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক বলে আর উল্লেখ করলাম না। রাত প্রায় ৯টায় আমরা পুরীতে ফিরে আসি।
পুরীর জগন্নাথ মন্দির ২২শে জুন সকালে প্রবীর বাবু আমাকে তাঁর গাড়ী করে জগন্নাথ মন্দিরের কাছাকাছি একটা জায়গায় নামিয়ে দেন। সেখান থেকে একটি রিক্সা করে মন্দির চত্বরে পৌঁছি। আজকের জগন্নাথ মন্দিরের স্থানে একটি স্তূপে বুদ্ধের একটি দন্ত সংরক্ষিত ছিল বলে পুরীর প্রাচীন নাম ছিল ‘দন্তপুরা’  – যা পরে শুধু ‘পুরা’ এবং সবশেষে ‘পুরী’তে রূপ নেয়। প্রাচীন কলিঙ্গের রাজধানীও ছিল এই দন্তপুরায়। একসময় দন্তপুরার রাজা বৌদ্ধ-বিদ্বেষী হলে, বুদ্ধানুরাগী রাজকন্যা বুদ্ধের দাঁতটিকে চুলের খোঁপার মধ্যে লুকিয়ে সিংহলে পালিয়ে যান এবং দাঁতটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন। প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপের উপর নবম শতকে শঙ্করাচার্য এক মঠ প্রতিষ্ঠা করে। সেই সময় থেকে এটি সম্পূর্ণ হিন্দু-ধর্মীয় মন্দিরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আজকের বৃহৎ মন্দিরটি দ্বাদশ শতকে গঙ্গাবংশীয় রাজা অনন্তবর্মণ কর্তৃক নির্মিত হয়। যে রথযাত্রার জন্য পুরীর এত নামডাক, সেটি কিন্তু প্রচলিত হয় বৃটিশ আমলে ১৮০৪এ, শ্রীচৈতন্যদেবের উদ্যোগে। এখানে উল্লেখ্য, বৌদ্ধযুগে বুদ্ধের দন্তোৎসব উদযাপিত হত তিন রথের মিছিল করে। সম্রাট হর্ষবর্ধনের কালে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ভারতে আসেন। তিনি তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্তে  উৎকল ভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, সে সময় উৎকলে ছয় ঘোড়া টানা রথে বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘের প্রতিকৃতি নিয়ে বৌদ্ধেরা বিহারে বেরুত। তাই অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন আজকের পুরীর রথের জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম তারই রূপান্তরিত সংস্করণ। জুলাই মাসে রথযাত্রার উৎসব হয়। তখন লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রীর সমাবেশ ঘটে। মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে ভক্তরা নাকি আত্মাহুতি দেয় জগন্নাথের রথের চাকায় পিষ্ট হয়ে। মন্দিরের সামনে দর্শনার্থীদের প্রচুর ভীড়। পায়ের জুতো ও ক্যামেরা জমা     দিয়ে মন্দির অঙ্গনে প্রবেশ করি। পা ফেলতে গিয়ে দেখি     সব জায়গা নোংরা ও দুর্গন্ধময়,     অন্য সব হিন্দু মন্দির (রামকৃষ্ণ     মিশনগুলি ছাড়া) যেমন হয়ে     থাকে, খালি পায়ে হাঁটার মত     নয়। তবু মন্দির দর্শনের জন্য     এই বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়।     তার মধ্যে আর এক বিড়ম্বনা –     প্রধান ফটক থেকে আমার     সাথে লেগে রইলো এক পা-া।     তাকে যত বলি আমার কিছু লাগবে না, সে তত নাছোড়বান্দার মত লেগে থেকে আমাকে এটা ওটা করার জন্য বলতে থাকে। ভীষণ বিরক্তিকর মনে হয়। অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পরও আমি যখন কিছুতেই তার কোন কথা শুনতে রাজী নই, তখন সে খুব অভদ্রোচিত অঙ্গভঙ্গী করে কি যেন বলে চলে যায়। পা-ার এই দৌরাত্মের অভিযোগ জানানোর জন্য কোন জায়গা বা কাউকে পেলাম না। যা হোক চারিদিক ঘুরে দেখি। ভিতরে মূল মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকায় জগন্নাথ বা পৃথিবীর অধিশ্বরের দেখা পেলাম না। মন্দিরের গঠনশৈলী ও স্থাপত্য দর্শনীয়। পরে জেনেছিলাম, হিন্দু ছাড়া নাকি অন্য ধর্মাবলম্বীদের এই মন্দিরে প্রবেশ নিষেধ। তবে, তারা যে কেন প্রবেশদ্বারে আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করে নি, তা বুঝলাম না। মন্দির দর্শন শেষে জুতো ও ক্যামেরা সংগ্রহ করে একটি রিক্সা করে রেস্ট হাউজে ফিরে আসি। ধৌলী  জগন্নাথ মন্দির থেকে ফিরে তাড়াতাড়ি দুপুরের খাবার খেয়ে আমার এখানে আসার আসল উদ্দেশ্য সফল করতে বের হয়ে পড়ি। আমার এই ভ্রমণ-যাত্রার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল “ধৌলী দর্শন”, এবং তার সাথে উদয়গিরি ও খ-গিরি দেখা। আগেই প্রবীর বাবু আমার জন্য একটি ট্যাক্সি বলে রেখেিেছলেন। সেই ট্যাক্সিতে বেলা একটায় ধৌলীর উদ্দেশ্যে রওনা হই।  লাদাখ-ভ্রমণ পিছিয়ে যাওয়ায় বাড়তি সময় কাটাবার জন্য প্যান ওয়েসের মালিক প্রবীর বাবু যখন পুরী-ভুবনেশ্বর বেড়িয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন আমি পুলকে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছিলাম। তার কারণ, সম্রাট মহামতি অশোক পৃথিবীর সভ্যতা ও ইতিহাস পাল্টানোর কর্মযজ্ঞ যে স্থান থেকে শুরু করেছিলেন এবং যেখানে তিনি তাঁর নিজ হস্তে তাঁর প্রথম শিলালিপি (যা কলিঙ্গানুশাসন নামে পরিচিত) স্থাপন করেছিলেন, সে স্থান দর্শনের সুযোগ হবে। মনে হল যেন জন্ম-জন্মান্তরের আকাঙ্খা পূর্ণ হবে। তবে, তখন আমি মুখে কিছু প্রকাশ করি নি।

ভুবনেশ্বর-পুরী রোডে ভুবনেশ্বর থেকে ৫ কিমি গিয়ে, ডাইনে ৩ কিমি দূরে দয়া নদীর ধারে অনুচ্চ ধৌলী পাহাড়। ভুবনেশ্বরই ছিল অতীত কলিঙ্গ রাজ্যের রাজধানী। ভুবনেশ্বরের উপকন্ঠে ধৌলীতে খৃস্টপূর্ব ২৬১ সালে মৌর্য সম্রাট অশোকের ঐতিহাসিক কলিঙ্গ-যুদ্ধ ঘটে। ধৌলী পাহাড়ের পাদদেশে দয়া নদীর পাড়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সংঘটিত হয় রাজা কলিঙ্গ ও সম্রাট অশোকের ভয়াবহ যুদ্ধ যা ইতিহাসে ‘কলিঙ্গ যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। কলিঙ্গ বিজয়ে সম্রাট আশোকের নির্দেশে তাঁর সেনাপতি এক লক্ষ কলিঙ্গ সৈন্য হত্যা করে এবং দেড় লক্ষ সৈন্যকে বন্দী করে দাস হিসেবে নিয়ে আসে। সমসংখ্যক সাধারণ মানুষও মারা যায়। প্রায় এক মহাশ্মশানে পরিণত হয় কলিঙ্গ। দারুণ অনুশোচনায় দগ্ধ হন সম্রাট অশোক। দীক্ষা নিলেন বৌদ্ধধর্মে। আর অসি দিয়ে নয়, এবার জয় – প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। তাঁর দিগি¦জয়ের নেশা রূপ নিল ধর্ম-বিজয়ের মধ্যে। তাই ধর্মপ্রচারে প্রথমেই বেছে নিয়েছিলেন ওড়িশ্যাকেই।
ধৌলী পাহাড়ের যে স্থানে দাঁড়িয়ে সম্রাট আশোক লক্ষ সৈন্যের রক্তাক্ত মৃতদেহ ও তাদের তাজা রক্তে রঞ্জিত দয়া নদীর জল অবলোকন করে বিচলিত হয়েছিলেন, ঠিক সেই স্থানে স্মারক হিসাবে  পাহাড়ের  পাথর কেটে বানানো হয়েছে হাতির মুখ ও সামনের দুটি পা। হাতি এখানে  বুদ্ধের ও শান্তির  প্রতীক। এর অনতিদূরে ৫ী৩ মিটারের এক  প্রস্তর খন্ডে  খোদিত  আছে  সম্রাট অশোকের  প্রথম শিলালিপি অনুশাসন (ঋরৎংঃ জড়পশ ঊফরপঃ)।

পুরীর রেস্ট হাউজ থেকে রওনা দিয়ে ৪০মিনিটে ধৌলী পৌঁছে যাই। গাড়ী থেকে নেমে অনুচ্চ পাহাড়ে উঠি। প্রথমেই লোহার গ্রীল ও দেয়াল দিয়ে ঘেরা শিলালিপির স্থান। মনে হল, এই ঘেরা স্থানটির সৌন্দর্যহানি ঘটিয়েছে, কিন্তু নিরাপত্তা ও সুরক্ষার     খাতিরে     এটাকে মেনে নিতে হয়। আমাকে দেখে কেয়ার টেকার দরজা খুলে দেয়। ভিতরে প্রবেশ করে শিলালিপির পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে শিহরিত হই – এই পাথরের গায়ে সম্রাট অশোকের ছোঁয়া লেগে আছে। পাথরের গায়ে হাত দিয়ে, গাল কপাল লাগিয়ে অশোকের স্পর্শ অনুভব করি। কালো পাথরের গায়ে ব্রাহ্মী হরফে খোদাই করা রয়েছে ১১টি রাজাজ্ঞা বা অনুশাসন। আর দুটি অনুশাসন অন্য জায়গায়।  এই অনুশাসনে সম্রাট  অশোকের  বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ ও বিজিত  প্রদেশের সুশাসন সম্মন্ধে  রাজকর্মচারীদের
প্রতি নির্দেশ – রাজা প্রিয়দর্শী বলিতেছেন, “প্রজাগণ     সকলেই আমার পুত্রতুল্য, আমি আপন সন্তানের ন্যয়,     তাহাদের ঐহিক ও পারত্রিক মঙ্গল কামনা করি – এই     কথাগুলি তাহাদের  হৃদয়ঙ্গম করাইয়া দিবে। …  …”।

শিলালিপির স্থান থেকে আর একটু এগিয়ে     উপরে উঠলেই হস্তিমুখ। নিরেট পাথর কেটে বের করা     হাতির মাথা শুঁড় ও সম্মুখের দু’টি পা।

এখানে দাঁড়িয়ে দেখি, সামনে পাহাড়ের নীচে     বয়ে চলেছে ক্ষীণ তনু দয়া নদী, যার দু’তীরে দিগন্ত    বিস্তৃত সবুজ শষ্যক্ষেত্র – সেদিনের কলিঙ্গ যুদ্ধভূমি। চোখ     বন্ধ করতেই মানসপটে ভেসে উঠে অতীত ইতিহাসের     ছবি। দয়া নদীর তীরে সেদিনের কলিঙ্গ যুদ্ধভূমি  শিলালিপির পাহাড় থেকে নেমে একটু এগিয়ে রাস্তার উল্টোদিকে আর একটি  অনুচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় মুকুট সদৃশ শ্বেতশুভ্র  শান্তিস্তূপ বা ‘পীস প্যাগোডা’।  ১৯৭০এ জাপানি প্রতিষ্ঠান ‘কলিঙ্গ নিপ্পন বৌদ্ধ সঙ্ঘ’ এই পীস প্যাগোডা নির্মাণ করে। তারা ‘সদ্ধর্ম বিহার’ নামে একটি বিহারও নির্মাণ করেছে পাহাড় চূড়ায়। প্যাগোডায় স্থাপন করেছে আকর্ষণীয় এক বুদ্ধমূর্তি। প্যাগোডার পাহাড় থেকে নেমে তৃপ্ত মন নিয়ে গাড়ীতে উঠে বসি। পাহাড় চূড়ায় শ্বেতশুভ্র শান্তি¯তূপখ-গিরি ও উদয়গিরি  ধৌলী থেকে বের হয়ে আবার পুরী-ভুবনেশ্বর রোডে উঠি। ড্রাইভারকে বলি খ-গিরি ও উদয়গিরির পথে যেতে। ৫কিমি এগোতে রাজধানী ভুবনেশ্বর। নগরে প্রবেশের মুখেই ওড়িশ্যার আর এক বিখ্যাত মন্দির ‘লিঙ্গরাজ’। ড্রাইভার আমাকে লিঙ্গরাজ মন্দির দর্শনের জন্য অনুরোধ করে। আমি বল্লাম, আমি মানুষ রাজার-কাছ ম্ড়াাই না, আর এখানে লিঙ্গের রাজার কাছে যাব ? তাছাড়া শিবের পুরুষাঙ্গ দেখার ইচ্ছে আমার নেই। সে কি বুঝল জানি না, গাড়ী এগিয়ে চলল। (এখানে উল্লেখ্য, পুরীর সব ট্যাক্সি ও রিক্সা চালক বাংলা বুঝে, অনেকে বলতেও পারে)। আসলে, এখানে থামলে খ-গিরি-উদয়গিরি পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে, তখন সেগুলি আর ভাল করে দেখা হবে না। ভুবনেশ্বর থেকে ৬/৭ কিমি দূরে খ-গিরি ও উদয়গিরির। বেলা চারটায় ওখানে পৌঁছি। কোলকাতা-চেন্নাই জাতীয় মহাসড়কের নিকট পূর্বঘাট পর্বতমালার দুটি ছোট অনুচ্চ পাহাড়ে একটি সড়কের দুপাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বৌদ্ধগুহা উদয়গিরি ও জৈনগুহা খ-গিরি।  খ-গিরি ১২৩ ফুট ও উদয়গিরির ১১৩ ফুট উঁচু। উদয়গিরির প্রশেপথের পাশে টিকেট কাউন্টার। কাউন্টার থেকে টিকেট কেটে প্রথমে উদয়গিরি দেখতে যাই। উদয়গিরি প্রথমে  বৌদ্ধ গুহা হিসাবে নির্মিত  হলেও বৌদ্ধ-পরবর্তী যুগে  খরবেলা  রাজাদের সময়  জৈনদের  দখলে  যায়।  জৈনদের  আমলে অতীতের  গুম্ফা-গুলির  সাথে   আরো  কিছু  নুতন  গুম্ফা
যোগ হয়। প্রবেশপথের গোঁড়া থেকে সিঁড়ি দিয়ে অল্প উঠতেই স্বর্গপুরী গুম্ফা। দেয়ালে খোদিত এক সুন্দর  হস্তিমূর্তি।  স্বর্গপুরীর
উত্তর-পূর্বে বিশাল দ্বিতল রাণী গুম্ফা। এটি এখানকার  বৃহত্তম  ও  সুন্দরতম  ভাস্কর্য-ম-িত গুম্ফা। গুম্ফার ভাস্কর্যে হাতি, বানর, অসিযুদ্ধ ও খরবেলার রাজার বিজয় মিছিল প্রতিফলিত।এখানে ছোট বড় মিলিয়ে মোট ১৮টি গুম্ফা আছে। সবগুলি তেমন দর্শনীয় নয়।  তাছাড়া  সব  দেখতে  হলে  প্রচুর সময়েরও  প্রয়োজন।  তাই  বেছে  বেছে কয়েকটি গুম্ফা দেখি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আর একটি গুম্ফা হল হস্তি গুম্ফা। এই গুম্ফায় ১৯০২সালে পালি ভাষায় একটি শিলালিপি আবিস্কৃত হয়।
উদয়গিরির গুম্ফা দর্শন শেষ করে     খ-গিরিতে আসি। এখানে মোট ১৫টি     গুম্ফা আছে। কয়েকটি গুম্ফা সত্যি     দর্শনীয়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথমে ১নং ও     ২নং গুম্ফা। ২নং গুম্ফা বেশ কারুকার্যম-িত     ও জীবজন্তু শোভিত। ২নং গুম্ফার মাথার     উপর নাগরাজের ভাস্কর্যম-িত দ্বিতল ৩নং     গুম্ফা। ২নং গুম্ফার সামনে দাঁড়িয়ে      উপরের দিকে দেখছি, পাশে নারীপুরুষ ও     ছেলেমেয়ে নানা দর্শনার্থী। হঠাৎ এক বানর     লাফ দিয়ে আমার কাঁধে চড়ে বসে।     পাশের  দর্শনার্থীরা  ভয় পেয়ে হৈ চৈ করে
হস্তি গুম্ফা    উঠে। আমি তাদের অভয় দিই। বলি,  জৈন-মন্দিরের বানর তো, তেমন বাঁদরামি করবে না, অহিংস হবে। আমি গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করি। ভাবলাম, কিছু একটা খাবার না দিলে বোধ হয় কাঁধ থেকে নামবে না। পাশের এক দর্শনার্থীর কাছ থেকে কয়েকটি বাদাম চেয়ে নিয়ে দিলে বানরটি লাফ দিয়ে নেমে যায়। ভাবছি – এত দর্শনার্থীদের মধ্যে আমার কাঁধে কেন লাফিয়ে উঠল, আমাকে কি তার সগোত্রীয় কেউ মনে হয়েছিল ?  যাক, আরো কয়েকটি গুম্ফা দেখে নীচে নেমে আসি। তারপর পুরী রওনা হই। সন্ধ্যে সাতটায় পুরী পৌঁছি।
২৩শে জুন সকাল ৮টায় আমরা কোলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। রাত প্রায় ৯টায় আমরা কোলকাতা পৌঁছি।

স্বল্প সময়ের ঘটনাবহুল এই অনির্দিষ্ট ভ্রমণের এখানেই ইতি। মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মত, আমার বহুদিনের আকাঙ্খিত সম্রাট আশোকের কলিঙ্গানুশাসন শিলালিপি দর্শন – জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্মরণীয় ঘটনা হিসাবে বিরাজ করবে।